পুরুষ রূপে এক দুঃসাহসী নারী শাসক মিশরের ফারাও হাটশেপসুট

মিশরের ত্রয়োদশ ফারাও হাটশেপসুট নারী হওয়া সত্ত্বেও সকল রীতি ভেঙে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। তিনি পুরুষসম্রাটের পোশাকে ও নকল দাড়ি ধারণ করে জনগণের সামনে পৌরুষপূর্ণ ভাবমূর্তী নিয়ে রাষ্ট্রী শাসন করেছেন।

পুলক ঘটক: রাণী নয়, তাঁকে রাজা বলা হতো; সম্রাজ্ঞী নয়, বলা হতো সম্রাট। নারী হলেও, তাঁর থুতনিতে দাড়ি দেখা যায়। কারণ তিনি নারী হয়েও স্বয়ং ‘ফারাও’ (ফেরাউন)। সুপ্রাচীন ভাস্কর্যগুলো তাঁর পৌরুষভরা নারী রূপের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে। নাম তাঁর হাটশেপসুট (Hatshepsut) –বিশ্ব ইতিহাসের প্রাচীনতম নারী রাষ্টনায়কদের একজন। ’রাষ্ট্রনায়ক’ না বলে তাঁকে ‘রাষ্ট্রনায়িকা’ বলা উচিত কিনা সে বিশ্লেষণ পরে।
যিশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বকাল, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। ভারতবর্ষে যখন মহাভারত রচনা হয়, সময়টা তারও আগের। তবে যে কাহিনীটি বলছি, তা পৌরাণিক গল্পগাথা নয়; ইতিহাসের এক বাস্তব চরিত্র।
তৎকালীন মিশরে শুধুমাত্র পুরুষরাই ছিল রাজার আসনে বসার যোগ্য। কিন্তু হাটশেপসুট এক নারী—যিনি প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিয়ম ভেঙে ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করেছিলেন। নিজ যোগ্যতায় রাজার আসনে বসেছিলেন —হয়েছিলেন ত্রয়োদশ ফারাও।
তিন হাজার বছরের ফারাও ইতিহাসে, তাঁর আগে কেবল দু’জন নারী ‘রাজা’ হিসেবে রাজত্ব করেছিলেন। তবে তারা সত্যিকারের কর্তৃত্ব পাননি। হাটশেপসুট এবং তাঁর ১৪০০ বছর পরের ক্লিওপেট্রা ছাড়া সে যুগের আর কেউই পূর্ণ রাজ-কর্তৃত্ব পাননি।
বাবা ১ম থটমসে এবং মা আহমোসের আদরের দুলালী ছিলেন হাটশেপসুট। কানাঘুষা ছিল, ফারাও নিজে তাঁর এই কন্যাটিকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নারীর জন্য তা এতটাই অসামঞ্জস্য ছিল যে, তা ঘোষণা করার সাহস পাননি।
সমবয়সী সৎ ভাই ২য় থটমসের সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয় হাটশেপসুটের; বয়স যখন বারো-তেরো। বাবার মৃত্যুর পর রাজা হওয়ার সৌভাগ্য না হলেও রাণী হয়েছেন। কোলে পুত্র সন্তান আসলে হবেন রাজমাতা। কিন্তু জন্ম নিল কন্যা সন্তান নেফেরু —কপাল এমনই!
এরপর স্বামীও মারা গেল অসময়ে। নিয়ম মাফিক রাজভাগ্য চলে গেল দ্বিতীয় রাণীর (মতান্তরে একজন দাসীর) পুত্র ৩য় থটমসের কাছে। কিন্তু ৩য় থটমসে তখন মাত্র দুই বছরের শিশু।
আবোধ শিশুকে ‘ফারাও’ ঘোষণা করা হলেও তাঁর পক্ষে রাজ্য পরিচালনার জন্য ‘তত্ত্বাবধায়ক’ দায়িত্ব পান হাটশেপসুট। পাটরাণী হিসেবে, রাজনৈতিক দক্ষতায় অন্যূন হিসেবে এবং যথাযথ ব্যক্তিত্ব ও কর্তৃত্বের অধিকারীনি হিসেবে তিনি সভাসদগণের আস্থায় ছিলেন। সুতরাং শিশু রাজার পক্ষে রাজকর্তৃত্ব পেলেন হাটশেপসুট।
কথা ছিল, রাজা ৩য় থটমসে বড় হয়ে রাজ্যের হাল ধরার আগ পর্যন্ত তাঁর পক্ষে রাজমাতা হাটশেপসুট এই দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু রাজনীতির কলাকৌশল ও ক্ষমতার রীতি শিখে গিয়েছিলেন এই নারী। আর তাঁর দৃষ্টি আরও উচ্চশিখরে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষায় ছিল।
রাজত্বের সপ্তম বছরে তিনি উত্তরাধিকারের নিয়ম পরিবর্তন করেন এবং সাহস করে নিজেকে ‘ফারাও’ ঘোষণা করলেন। নিজের মাথায় ধারণ করলেন রাজমুকুট।
রাজস্বীকৃতি আরও পাকাপোক্ত করার জন্য হাটশেপসুট দাবি করেন—তাঁর জন্ম হয়েছে দেবতা আমুনের ইচ্ছায়। মন্দিরের দেয়ালে লেখা হয়, তাঁর বাবা ১ম থটমসের রূপ ধারণ করে স্বয়ং আমুন তাঁর ঘুমন্ত মায়ের সাথে মিলিত হয়েছিলেন এবং সেটিই তাঁর জন্মের কারণ। এভাবে তিনি বলেন, “আমি শুধু একজন রাজ-কন্যা নই, একজন দেব-কন্যা।” তাঁর শবদেহের মন্দিরে খোদাইকৃত হায়ারোগ্লিফিক গল্পগুলিতে এখনো তাঁর ঐশ্বরিক জন্মবৃত্তান্ত লেখা রয়েছে।
নিজ কন্যা নেফেরুকেও তিনি দেবতা আমুনের ছায়াপ্রসূত ঘোষণা দিয়েছিলেন—যাতে রাজবংশের প্রতি জননির্ভরতা বজায় থাকে। সেই কন্যার বিয়ে দেন শিশু রাজা ৩য় থটমসের সাথেই – যাতে সিংহাসন ভবিষ্যতে সমর্পণ করতে হলেও রাজকীয় বংশ এবং তাঁর নিজের প্রভাব অটুট থাকে।
Sphinx of Pharaoh Hatshepsut – A Legacy Carved in Stone
হাটশেপসুটের জীবন ছিল এক নারীর আত্মবিশ্বাস, কৌশল ও দৃঢ়তার অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি যুদ্ধবাদী ছিলেন না। তাঁর শাসনকাল ছিল শান্তিপূর্ণ। সিংহাসনে তাঁর ২০ বছরের শাসনামলে হাটশেপসুট রাজ্যের সমৃদ্ধি, শিল্প ও নির্মাণে নিজেকে ঢেলে দিয়েছিলেন। তিনি কর্ণাক এবং লুক্সরের মহান মন্দিরগুলিকে সম্প্রসারিত করেছিলেন; সমগ্র মিশরে বহু মন্দির পুনরুদ্ধার করেছিলেন। সর্বোপরি নাইল নদের পশ্চিম তীরে অবস্থিত দেইর এল-বাহরির পাহাড়ে নির্মাণ করে গেছেন বিশাল এক শবদেহ মন্দির—যেখানে লুকায়িত অসংখ্য মমি।
ভাস্কর্য, শিল্পকলা, বাণিজ্য ও সুশাসন বা শক্ত শাসনের দুর্দান্ত সাফল্য দেখিয়ে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর কীর্তিসমূহ মুছে দেওয়ার বহু কাপুরোষোচিত চেষ্টা হয়েছে, যার প্রমাণ জেগে আছে প্রত্নসম্পদের গায়ে গায়ে। নারী হয়ে ”আইন লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখল” করার অভিযোগে মৃত্যুর পর এই প্রতিশোধ! নারী হওয়ার কারণে পুরাতন ইতিহাসবিদরাও তাঁকে একই দৃষ্টিতে ছোট করেছেন বলে বিস্তর অভিযোগ। অথচ তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যাটাগিরি দেখানোর সাহস জৈবিক ব্যাটাছেলে ৩য় থটমসের হয়নি।
হাটশেপসুট প্রমাণ করেছেন, সমাজ যতই পুরুষতান্ত্রিক হোক, সত্যিকারের নেতৃত্ব কখনও কেবল লিঙ্গ দিয়ে মাপা যায় না। ফারাও হওয়ার পর লিঙ্গ প্রতিবন্ধকতার মুখে টিকে থাকতে তিনি অভিনব কলাকৌশল অবলম্বন করছিলেন। পরিধান করেছিলেন পুরুষ সম্রাটের পোশাক–- মাথায় রাজার মুকুট, কোমরে রাজকীয় কিল্ট, মুখে নকল দাড়ি।
প্রকৃতপক্ষেই তিনি নকল দাড়ি পরতেন কিনা নিশ্চিত হওয়া না গেলেও তাঁর ভাস্কর্যগুলো শ্মশ্রুশোভিত। গবেষকদের অনেকের ধারণা, তিনি জনসমক্ষে প্রদর্শিত ভাস্কর্যসমূহে শ্মশ্রু সংযুক্ত করার আদেশ দিয়েছিলেন, যাতে জনমনস্তত্বে তাঁর রাণীমূর্তী নয়; রাজাবয়ব বা পৌরুষ প্রকাশ পায়।
হায় নারী! শাসক হলেও; সফল মানুষ হলেও তোমাকে পুংলিঙ্গের রূপ ধরতে হবে! প্রজারক্ষক বা দেশের রক্ষক হলেও তোমাকে হতে হবে পুরুষসুলভ!
হাটশেপসুটের এভাবে পুরুষের প্রতিভূ হওয়া আধুনিক নারীবাদী দৃষ্টিতে ন্যায্য প্রতীয়মান হয় কিনা, সন্দেহ আছে। তবে নারীকে শাসক হিসেবে মানলেও ভাবাবেগে এবং রাষ্ট্রাচারে আজকের যুগেও আমরা পুরুষতন্ত্রী, সন্দেহ নেই।
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় ভারতের লোকসভায় বিরোধীদল ‘স্বতন্ত্র পার্টি’র এমপি পিলু মোদি বলেছিলেন, “মন্ত্রীসভায় একজনই পুরুষ আছেন; ইন্দিরা গান্ধী”। এমন মন্তব্যের মাধ্যমে ইন্দিরাকে উঁচুতে ওঠানো হয়েছিল, না নিচে নামানো হয়েছিল? কথাটি কিন্তু পরবর্তীতে বহুচর্চিত বাক্যে পরিণত হয়েছিল।
ব্যক্তি ইন্দিরাকে তাতে উচ্চতায় দেখানোর চেষ্টা হলেও, সামগ্রিক অর্থে নারীকে কিন্তু নিচু দৃষ্টিতেই দেখা হয়েছে। বিরোধী নেতা তথা সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মন এ কথায় বুঝিয়েছিল, ‘কংগ্রেসের মন্ত্রীসভায় ‘সবগুলা মাইয়া মানুষ’ —মানে ছোট— যারা ইন্দিরার মতো একজন নারীর নেতৃত্বে চলে।’ অর্থাৎ ইন্দিরা নারী হওয়ায় পুরুষদের চেয়ে উপরে থাকা একটি অস্বাভাবিক বিষয়! এই দৃষ্টিভঙ্গি আমরা আজও ক্ষয় করতে পারিনি।
নারী-ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘স্যার’ সম্বোধন না করলে তিনি মাইন্ড করেন, এমন অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। কেউ আবার ‘ম্যাম’ সম্বোধন শুনতে পছন্দ করেন। কোনটা নারীকে উপরে ওঠায়, কোনটা নামায়, তা আজও বিতর্ক।
দুই যুগেরও বেশিসময় বাংলাদেশের সরকার প্রধান ছিলেন নারী; বিরোধী নেতাও নারী। সংসদের স্পিকার পেয়েছি নারী। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আছেন নারী। রাষ্ট্রাচার অনুযায়ী তাদেরকে ‘স্যার’ সম্বোধন করা উচিত কিনা —নিস্পত্তি আজও হয়নি।
তারা কি বিভিন্ন পদে “পুরুষের মর্যাদায়“ বা “পুরুষের মহিমায়” অধিষ্ঠিত? সংগঠনের প্রধান নারী হলে তাঁকে চেয়ারম্যান, চেয়ার-ওম্যান, নাকি চেয়ারপার্সন বললে শোভন হয়? ‘S/he’ শব্দগুলো ইংরেজি’র ক্ষেত্রে স্পষ্টত নারী-পুরুষ বিভাজন করে। কিছুক্ষেত্রে ‘চেয়ারপার্সন‘ শব্দের মতো লিঙ্গনিরপেক্ষ শব্দ আবিস্কার করা গেলেও সবক্ষেত্রে তা পাবেন না; বাংলা ভাষায়ও উপযুক্ত প্রতিশব্দ নেই। ভাষাগত জায়গায় লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার কাজটি সহজ নয়। মননের জায়গায় মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়তো আরও কঠিন।
আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগের হাটশেপসুটকে রাষ্ট্রনায়ক বলবেন, নাকি রাষ্ট্রনায়িকা বলবেন আপনারাই সিদ্ধান্ত নিন। তবে ইতিহাস বলছে, তাঁর পারিষদবর্গ তাঁকে পুরুষতান্ত্রিক অবিধায় কুর্ণিশ করতেন। এই চর্চা তাঁকে প্রয়োজনের তাগিদে আত্মীকরণ করতে হয়েছিল; বিশ্বাসীদের লাইনে আনতে ধর্মকেও যথেচ্ছ ব্যবহার করতে হয়েছিল —দেবী সাজতে হয়েছিল। আচ্ছা, হাটশেপসুট কি নারীবাদী ছিলেন? নাকি পুরুষতন্ত্রী?
সর্বোচ্চ ক্ষমতা দাবি করা হাটশেপসুটের কাছে নিছক রসিকতা বা ছদ্মবেশ ছিল না— এটি ছিল নিয়তি এবং কর্তব্য। তিনি নিজেকে “রাজা নিজেই” (“the King Herself”) বলে অভিহিত করেছিলেন। নারীবাদী লেখিকা মোনা এলতাহাওয়ির বলেছেন, “হাটশেপসুটের পুরুষতান্ত্রিক মূর্তি এক অনিবার্য প্রশ্নের উদ্রেক ঘটায়। ‘রাজা নিজেই’ উপাধিটির অর্থ কী, যা পিতৃতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করেছে, আজও করছে”? তাঁর যুগে কোনও মিশরীয় কখনও এমন সাহসীকতার সাথে লিঙ্গ-আইন ভেঙে তছনছ করে দেয়নি।
দেইর এল-বাহরির বিশাল মূর্তিগুলিতে হাটশেপসুটকে আজও দেবতা আমুনের উপাসনায় হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে দেখা যায়। চিবুকে রাজার কুঁচকানো শ্মশ্রু ধারণ করে তিনি হাতে নিয়েছেন নৈবেদ্য পাত্র। ইতিহাসবিদ ব্রিয়ার এবং হবস লিখেছেন, “মুকুট ও কিল্ট পরিধানকৃত এই মূর্তিগুলি তাঁর রাজকীয় কর্তৃত্ব ঘোষণা করে। কিন্তু এখানেও তাঁর শিলালিপিগুলি নীরবে তার নারীত্বকে সংরক্ষণ করে।”
‘হাটশেপসুট’ নামের অর্থ ‘সর্বশ্রেষ্ঠ মহীয়সী নারী,’ যা তিনি কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন।
spot_imgspot_img
spot_img

আলোচিত

Related Articles