কন্যা দান নয়, আত্মসম্প্রদান

মহাভারতের শকুন্তলা থেকে বিংশ শতাব্দীর রাধারাণী — সনাতন ধর্মের সম্মুখগামী দিগদর্শন

পুলক ঘটক:

১৯৩১ সালের ঘটনা। সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ দেবের ‘কাব্য-দিপালী’ পত্রিকা সম্পাদনায় সাহায্য করছিলেন এক বিধবা নারী। কারও চোখে তিনি হয়তো “সামান্যা রমণী।” বাস্তবে তিনি তখন “অপরাজিতা” ছদ্মনামে খ্যাত বাংলার এক বিশিষ্ট কবি। প্রকৃত নাম রাধারাণী দেবী। এই কবির সাথে হৃদয়ের গাঁটছড়া তৈরি হয়ে যায় নরেন্দ্রনাথের। তাঁদের হার্দিক সম্পর্ক বিয়ের সম্পর্কে গড়ায়। দু’জনের বয়সে পনেরো বছরের ব্যবধান।

একে তো বিধবা; সে আবার কবি! নেপথ্যে হয়েছে প্রেম — দুই সাহিত্যিকের প্রেম! সে প্রেমে ধর্ম ও আচার শুধু উপেক্ষিতই হল না, কন্যাসম্প্রদানেও তৈরি হল নতুন নজির। নিজেই নিজেকে সম্প্রদান করলেন রাধারানি দেবী। ১৯৩১-এর ৩১মে সেই বিয়ের পরের দিন সংবাদপত্রে শিরোনাম হয় — ‘রাধারানি-নরেন্দ্র দেব বিবাহ: কন্যার আত্মসম্প্রদান’।

সনাতন ধর্ম কি নারীকে আত্মসম্প্রদানের অধিকার দেয়? এমন বিয়ের ব্যাপারে কি বলছে হিন্দু শাস্ত্র? আসুন প্রথমে আত্মসম্প্রদানের ঘটনাটি জেনে নেই।

রাধারাণীর জীবন বিপ্লব

রাধারাণীর জীবন যেন এক বিপন্ন নদীর ছুটে চলা —কখনও শান্ত, কখনও বন্যা, কখনও আবার নীরব বালুচরে থেমে থাকা। মাত্র তেরো বছর আট মাস বয়সে, তাঁর জীবনের প্রথম স্রোত থেমে গেল আকস্মিক ঝড়ে। স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ কেড়ে নিল এশিয়াটিক ফ্লু নামের এক মারণ ব্যাধি। চোখের সামনে পৃথিবী ফিকে হয়ে গেল।

শুরু হল এক নিঃশব্দ রাত্রির জীবন — হিন্দু বিধবার জীবন। রঙ হারানো পোশাক, গলায় গয়না নেই, চুল কেটে দেওয়া — সমাজ তার শোককে যেন শ্বেত পাথরের ভার দিয়ে ঢেকে দিল। খাবার হিসেবে পেল কেবল হবিষ্যান্ন, একাদশীতে রাখতে হত নির্জলা উপবাস। আনন্দ, হাসি, সাজগোজ — সব গিলে খেল বিধবার জন্য বানানো রীতিনীতি।

এক ব্যতিক্রমী ভাগ্য পেয়েছিলেন রাধারাণী। শাশুড়ি সুশীলা বালা তাঁর বৈধব্যের শাসক হয়ে নয় বরং যেন করুণার দেবী হয়ে পাশে দাঁড়ালেন। স্নেহে ভরিয়ে দিলেন তাঁর বৌমার শুকনো জীবন। ঠিক করলেন, এই মেয়ের আবার বিয়ে দেবেন—তাঁর জীবনকে ফের রঙিন করবেন। কিন্তু সমাজ যে ঘন অন্ধকারে! জীবনের রঙ ফোটানো সেখানে সহ্য হয় না — আঁধারের গাঢ়তা সেখানে মহিমাময়। বাঁধ সাধলেন স্বয়ং রাধার মা, নারায়ণী দেবী। তিনি সাচ্চা সেকেলে নারী। বিধবা মেয়ের আবার বিয়ে হবে শুনে আঁতকে উঠলেন। খবর পাঠালেন— “আমার মেয়ের দ্বিতীয়বার বিয়ে হবে না। তা হলে সমাজে মুখ দেখানো যাবে না।” ভাই ও জামাইকে পাঠালেন মেয়ে ফিরিয়ে আনতে।

বাধ্য হয়ে সুশীলা বালা বৌমাকে পাঠিয়ে দিলেন বাপের বাড়ি। কিন্তু সেখানে গিয়ে রাধারাণী বুঝলেন বিধবার ‘শুদ্ধাচার’ কাকে বলে। খুলে নেওয়া হল তাঁর গয়না, ছেঁটে দেওয়া হল মাথার চুল, পরানো হল সাদা থান। খাদ্য হিসেবে রইল সেই হবিষ্যান্ন, একাদশীতে আবার উপবাস।

তবুও ভাগ্য থেমে থাকেনি। কিছুদিন পর তিনি ফিরে এলেন শ্বশুরবাড়িতে। তবে মা নারায়ণী দেবী প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন—রাধা কোনোদিন রঙিন শাড়ি পরবে না, আমিষ খাবে না। এটা জেনে শাশুড়ি সুশীলা বালা খুব কষ্ট পেলেন, কিন্তু হাল ছাড়লেন না। তিনি আবার রাধার গায়ে তুললেন রঙিন কাপড়, পরালেন চুড়ি, গলায়-কানে দিলেন সোনা। বললেন — “তুই আমার বড় ছেলে।”

এ সময় শুরু হল এক নতুন অধ্যায়; সারাদিন লেখাপড়া। গৃহবন্দিনী রাধার মনের দরজা খুলে গেল সাহিত্য জগতে। কলমের ডগায় তিনি খুঁজে পেলেন মুক্তির পথ। খাতার পর খাতা ভরে উঠল কবিতা আর গল্পে।

এই সময়েই ছোট পিসিমা চমৎকারিণী দেবী তাঁর লেখা পাঠালেন কবি নরেন্দ্র দেবের কাছে। নরেন্দ্রর অভিব্যক্তি—
“আমি কবিতা পড়ে অবাক হয়ে গেলুম।” নরেন্দ্রর উদ্যোগে রাধুর কবিতা প্রকাশ হতে লাগলো।

রাধারাণী সাহিত্যিক হয়ে উঠলেন, তবে তিনি প্রকাশিত হলেন না নিজের নামে। সমাজ তখনও নারীর লেখার জায়গা বুঝে নিতে শেখেনি। তাই এক নতুন নামের জন্ম হল—‘অপরাজিতা’।
একদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই তাঁকে ডেকে পাঠালেন।
“এই কবিতা কার লেখা?”—প্রশ্ন করলেন তিনি।
রাধা বিনম্রভাবে বললেন,
“গুরুদেব, এই কবিতা পুরুষের রচনা নয়, নারীরই সৃষ্টি। ‘অপরাজিতা’ তার আসল নাম নয়, ছদ্মনাম। সময় হলে সে আপনার সামনে এসে প্রণাম করবে।”

সাহিত্য জগতের পুরুষতান্ত্রিক অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদই জন্ম দিয়েছিল ‘অপরাজিতা’ নামের এই দ্বিতীয় সত্তাকে। এমন দক্ষতা ছিল তাঁর, যে তিনি আলাদা হাতের লেখার ছাঁদ পর্যন্ত রপ্ত করেছিলেন—যাতে কেউ বুঝতে না পারে, ‘রাধারাণী’ আর ‘অপরাজিতা’ আসলে একই মানুষ।

কবি রাধারাণী যিনি ‘অপরাজিতা’ ছদ্মনামে লিখতেন।

রাধারাণী ও নরেন্দ্র দেব কবে প্রথম দেখা করেছিলেন, তা জানা যায় না। তবে ১৯২৭ সালে প্রকাশিত কাব্যদীপালির প্রথম সংস্করণের সম্পাদনায় রাধারাণী নরেন্দ্র দেবকে সাহায্য করেছিলেন। ঠিক চার বছর পর, ১৯৩১ সালে, দৈনিক বঙ্গবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হল খবর—

“রাধারাণী-নরেন্দ্র বিবাহ, কন্যার আত্মসম্প্রদান”

পুরো সাহিত্য সমাজে তখন আলোড়ন পড়ে গেল! কারণ, বিংশ শতকের ত্রিশের দশকে এক বিধবার পুনর্বিবাহ ছিল বিরল ঘটনা। তাও আবার এমন একজনের সঙ্গে, যিনি বিপত্নীকও নন।

তাঁর ও নরেন্দ্র দেবের প্রথম সাক্ষাতের দিনটি কেউ জানে না, কিন্তু সাহিত্য তাদের একসাথে বেঁধেছিল। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত কাব্যদীপালির সম্পাদনায় তাঁরা একসাথে কাজ করেন। এরপর ১৯৩১ সালে হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ল দৈনিক বঙ্গবাণীতে—
“রাধারাণী-নরেন্দ্র বিবাহ, কন্যার আত্মসম্প্রদান।”
পুরো সমাজ তোলপাড় হয়ে গেল। কারণ, তখনও এক বিধবার পুনর্বিবাহ ছিল সাহসী, প্রায় অপরাধের সমান কাজ। তবু রাধারাণী সাহস করেছিলেন, কারণ তিনি জানতেন—জীবন থেমে থাকার জন্য নয়।

কিন্তু একটাই দুঃখ থেকে গেল। বিয়ের দিন তিনি কাউকে না জানিয়ে লিলুয়ার প্রথম শ্বশুরবাড়ি থেকে চলে এসেছিলেন। সারা জীবন সেই না-বলা বিদায়ের অপরাধবোধ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। একদিন মেয়ে নবনীতা তাঁকে প্রশ্ন করল,
“মা, তুমি কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করলে কেন?”
রাধা মৃদু হেসে বললেন,
“ওরা সবাই আমার ওপর নির্ভর করত। যদি জানত, হয়তো কষ্ট পেত। তাই কিছু না বলেই চলে এসেছিলাম।”

১৯৩৪ সালে, বিয়ের তিন বছর পরে, রাধা সন্তানসম্ভবা হলেন। দক্ষিণ কলকাতার বাড়িতে ছিলেন নরেন্দ্রর মা মৃণালিনীর সঙ্গে। হঠাৎ এক দুপুরে দরজায় টোকা—দেখলেন, তাঁর প্রিয় শাশুড়ি সুশীলা বালা দাঁড়িয়ে। রাধা লজ্জায় মাথা নিচু করলেন, কিন্তু সুশীলা বালা তাঁকে বুকে টেনে নিলেন।

সন্তান জন্ম নিল, কিন্তু বেশিদিন বাঁচল না। নিউমোনিয়ায় ছোট্ট ছেলেটি চলে গেল। রাধার প্রাণ ভেঙে গেল, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ল, হাঁপানিতে ভুগতে লাগলেন। তখন চিকিৎসক শ্যামাদাস বাচস্পতি বললেন—“তাজা বাতাস, খোলা হাওয়া—এটাই এখন তোমার ওষুধ।”

রাধা নিজের হাতে নকশা করে বানালেন নতুন বাড়ি—নাম দিলেন ‘ভালো-বাসা’। সেই বাড়িতে আবার ফিরল প্রাণ, ফিরে এল হাসি। সাহিত্য ও জীবনে তখন তিনি প্রতিষ্ঠিত। সমাজও তাঁকে আর অবজ্ঞা করতে পারল না। এমনকি তাঁর প্রথম শ্বশুরবাড়ির লোকেরাও ‘ভালো-বাসা’য় আসা-যাওয়া শুরু করলেন।

১৯৩৭ সালে তিনি আবার সন্তানসম্ভবা হলেন। ১৯৩৮ সালের ১৩ জানুয়ারি, সেই ভালো-বাসা বাড়িতে জন্ম নিল এক কন্যাসন্তান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে তাঁর নাম রাখলেন ‘নবনীতা’।
পরবর্তীকালে সেই নবনীতা দেবসেনই হয়ে উঠলেন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—
মায়ের মতোই স্বাধীন, মায়ের মতোই অপরাজিতা।

শাস্ত্রবিচার

রাধারাণীর জীবনের উপরোক্ত বর্ণনা আমি ”ধ্রুবতারাদের খোঁজে” ফেসবুক পেজ থেকে (তথ্য যাচাইয়ের পর) নিয়েছি। এ পর্বে আরেক জোড়া নরনারীর প্রণয়কাহিনী বলব, যাদের নিয়ে মহাকবি কালীদাস অমর কাব্যনাট্য লিখে গেছেন। তারও আগে লিখেছেন মহাকবি ব্যাসদেব। সে কাহিনী বর্ণনার আগে সামান্য শাস্ত্র বিচারের চেষ্টা করব। সনাতন শাস্ত্রগ্রন্থে সুপ্রাচীনকালের প্রথা অনুযায়ী আট (৮) রকমের বিয়ে নির্দেশিত আছে। এগুলো হল ১. ব্রাহ্ম, ২. দৈব, ৩. আর্য, ৪. প্রাজাপত্য, ৫. আসুর, ৬. গান্ধর্ব, ৭. রাক্ষস ও ৮. পৈশাচ।
‘ব্রাহ্মো দৈবস্তথৈবার্যঃ প্রাজাপত্যস্তথাসুরঃ।
গান্ধর্বো রাক্ষসশ্চৈব পৈশাচশ্চাষ্টমোহধমঃ।।’
(মনু ৩/২১)
পাত্র-পাত্রী নির্বাচন বা সংযোগ ঘটানোর প্রক্রিয়াভেদে বিয়ের এই আট রকমের প্রকারভেদ। অর্থাৎ আপনি যদি নিজে উপযাচক হয়ে আপনার মেয়েকে কারও কাছে নিঃস্বার্থে দান করে দেন, তাহলে সেটা এক প্রকার বিয়ে। শাস্ত্র অনুযায়ী এটি সর্বোৎকৃষ্ট, যার নাম ব্রাহ্ম বিবাহ।
যদি পূণ্যলাভের আশায় যজ্ঞের পুরোহিতকে দক্ষিণা হিসেবে নিজের কন্যারত্ন দান করে দেন, তা হবে অরেক প্রকার বিয়ে। এর নাম দৈব বিয়ে যা, দ্বিতীয় সর্বোত্তম। বলাবাহুল্য, আমাদের শাস্ত্রভক্ত দাদারা বর্তমানকালে পুরোহিতকে কন্যা দান করে পূণ্য অর্জনে রাজি নন।
ধর্মীয় উদ্দেশ্যে এক জোড়া বা দুই জোড়া গো-মিথুন গ্রহণের বিনিময়ে যদি কন্যা দান করেন তা আরেক রকম বিয়ে (আর্য বিবাহ)। ছেলে-মেয়ে সুখে সংসার করবে –এরকম চুক্তিতে যদি কন্যাদান করেন তাহলে হবে আরেক রকম বিয়ে। এর নাম প্রাজাপত্য বিবাহ, যা বর্তমানে আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত রয়েছে। আট প্রকার বিয়ের তালিকায় এটি চতুর্থ; অর্থাৎ এটি মধ্যম প্রকারের বিয়ে।
শুল্ক বা পণের বিনিময়ে আপনি যদি আপনার মেয়েকে (বিক্রি করে) দেন তবে তা আরেক রকম বিয়ে। এর নাম আসুর বিয়ে, ভাল’র ক্রমে যার অবস্থান ৫ নম্বরে। দান করা কিংবা বিক্রি করা নয়; যদি পাত্র-পা্ত্রী নিজেরা পরস্পরকে পছন্দ করে বিয়ে করে, তাহলে সেটি আরেক প্রকারের। একে বলে গান্ধর্ব্য বিয়ে। তালিকায় এটি ৬ নম্বরে। শাস্ত্রে এর বিধান আছে।
যদি ক্ষমতার জোরে কারও মেয়েকে বলপূর্বক তুলে এনে বিয়ে করেন সেটা হবে আরেক রকম বিয়ে। একে বলে রাক্ষস বিয়ে যার অবস্থান ৭ নম্বরে। তবে শাস্ত্র অনুযায়ী ক্ষমতাধর ক্ষত্রিয়দের জন্য এ উত্তম বিয়ে, পুরাণ ও মহাভারতে যার অনেক দৃষ্টান্ত আছে। তবে এখনকার যুগে এটাকে ক্রাইম হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এরকম বীরত্ব কেউ দেখালে বাংলাদেশের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ অনুসারে অপহরণ মামলায় ফাসবেন এবং দন্ডনীয় হবেন।
আর যদি কোনো মেয়েকে ঘুমন্ত, উন্মত্ত বা নেশাগ্রস্ত করে তাকে প্রতারণাপূর্বক সম্ভোগ করেন সেটি হবে সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রকারের বিয়ে –যার নাম পৈশাচ বিয়ে। এধরনের কর্মকে সে যুগেও প্রশংসা করা হয়নি এবং এখনকার আইনেও ধর্ষণ দণ্ডনীয় অপরাধ।
পূর্ববোক্ত আট প্রকার বিয়ের আবার বর্ণভেদে বিয়ের অধিকার ভেদ আছে। অর্থাৎ ব্রাহ্মণের জন্য যা বৈধ, শূদ্রের জন্য তা বৈধ নয়। এছাড়াও বর্ণ ভেদে তিন প্রকার বিয়ে আছে – সমলোম, অনুলোম ও প্রতিলোম। বিয়ের কোয়ালিটি অনুযায়ী সন্তানদের বর্ণ পরিচয় শাস্ত্রে নির্ধারণ করা আছে। সেই অনুযায়ী বিদ্যমান হিন্দু আইনেও অধিকার নির্ধারণ করা আছে।
আমি এই যে বিবরণ দিলাম. এজন্য আমাকে কেউ গালি দেবেন না আশা করি। কারণ এগুলো শাস্ত্র এবং আইনের কথা, আমার কথা নয়। গালি দিলে তা শাস্ত্রপ্রণেতা মুনি ঋষিদের উপরে গিয়ে পড়বে। যেহেতু বিবাহই পারিবারিক আইন রচনার ভিত্তি, তাই আমি বিষয়গুলো আলোচনা করছি। শাস্ত্র এবং আইন জানলে আশা করি আপনারও ক্ষতি হবে না।
এই শাস্ত্র কথায় একটি বিষয় পরিস্কার। নারী দানের বস্তু, বিক্রয়ের বস্তু, জোর করে ছিনিয়ে নেয়ার বস্তু এবং অন্যায় পন্থায় উপভোগের বস্তু –এ সবই শাস্ত্র নির্ধারিত। এর সঙ্গে এটিও শাস্ত্র নির্ধারিত, তারা মানুষ। তারা চাইলে কারও দান বা বিক্রয়ের বস্তু না হয়ে নিজেদের পছন্দে সঙ্গী নির্বাচন করতে পারে।
শাস্ত্রের এই নির্দেশনায় গান্ধর্ব্য বিবাহ থাকলেও স্বয়ংবর সভায় পাত্র বাছাই করার ব্যবস্থা দেখা যায় না। কিন্তু মহাভারতে তার অনেক প্রমাণ আছে। অর্থাৎ কিছু বিষয় স্মৃতি শাস্ত্রে না থাকলেও প্রথা বলবৎ।
কবি দৃম্পতি নরেন্দ্র দেব ও রাধারাণী দেবী এবং তাদের শিশুসন্তান নবনীতা দেবসেন
কলিযুগের প্রথম ব্যতিক্রম, ইতিহাসে অপরাজিতা কবি রাধা রানী দেবী ১৯৩১ সালে নিজেই বিয়েতে নিজেকে সম্প্রদান করেছিলেন। বাবা-জ্যাঠারা সম্প্রদান করেননি। আপনি বলতেই পারেন, “কলিযুগে আরও কত কি দেখব!” মনে রাখবেন, মানবীয় সাল/বর্ষ গণনার ইতিহাসে সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর বা কলি যুগ নামক কোনোকিছুর অস্তিত্ব নেই। কলি যুগের এই বিয়ে অতীতের বিভিন্ন প্রকারের বিয়ের চেয়ে উত্তম না অধম সে বিচারও মনুষ্যত্বের। এযুগের নারী-পুরুষ আসলে নিজেরাই নিজেদের সম্প্রদান করে, কারণ কালটা কলিযুগ- যা অতীতের চেয়ে উন্নত যুগ।
প্রিয় পাঠক, কলিযুগ আপনার অপছন্দ তাই না? আপনি প্রাচীনপন্থী, তাই প্রাচীনের প্রতি আপনার ভালবাসা থাকলে আপনাকে জোর করে আধুনিক বানাতে চাই না। কিন্তু সেই প্রাচীনকালেও যদি আত্মসম্প্রদান ঘটে থাকে তবে মানবেন তো? যদি পুরাণে বর্ণিত দ্বাপর যুগেও নারীর নিজেই নিজেকে সম্প্রদানে বিয়ে হয়, তবে মানবেন তো?
পুরাণে আত্মসম্প্রদানের বিভিন্নরকম একাধিক নিদর্শন আছে, তার একটি বলব। সে ছোটখাটো লোকের বিয়ে নয়, কৌরব বংশের আদি পুরুষ স্বয়ং রাজা দুষ্মন্ত’র বিয়ে হয়েছিল বনে জন্ম নেয়া নারী শকুন্তলার আত্মসম্প্রদানে। শকুন্তলা বিয়েতে নিজেই নিজেকে দুষ্মন্ত’র কাছে সম্প্রদান করেছিলেন। ঐ যুগলের প্রণয়কাহিনী শুনুন। মহাভারতের আদিপর্বের ৮৮ অধ্যায় থেকে তুলে ধরছি।

বনের মধ্যে পথ হারানো তৃষ্ণার্ত রাজা দুষ্মন্ত হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলেন কন্ব মুনির আশ্রমে। সে নির্জন শান্তির নিলয়ে দেখা পেলেন অপূর্ব সুন্দরী শকুন্তলার। অচেনা সে তরুণী তাকে পানাহার করালেন, শান্তি দিলেন। কিন্তু তাকে দেখে রাজার অন্তর উথাল পাতাল।

শকুন্তলা মেনকা নামে এক বেশ্যার সন্তান; স্বর্গ-বেশ্যা! মর্ত্যের বেশ্যারা উপভোগ্য হলেও তাদের সন্মান নেই। তবে স্বর্গের বেশ্যাদের সম্মান-মর্যাদা অনেক। বেশ্যার মেয়ে জানলে আমরা কেউ বিয়ে করতে চাই না। কিন্তু আমাদের প্রাচীন মুনি-ঋষি-মহাপুরুষদের অনেকেই বেশ্যার সন্তান।
বেশ্যা দেখলে ঋষিদের কাপড় ভিজে যাওয়ার ঘটনা অনেক আছে। মেনকাকে দেখেও বিশ্বামিত্র ঋষির সেই অবস্থা হয়েছিল। দু’জনের কৃতকর্মে জঙ্গলের মধ্যে শকুন্তলার জন্ম দিয়ে সেখানেই শিশুটিকে ফেলে দিয়ে গিয়েছিলেন সে মহান জন্মদাতারা। কণ্ব মুনি শিশুটিকে কুড়িয়ে পেয়ে সন্তানস্নেহে বড় করেছিলেন।
সেই শকুন্তলা এখন তরুণী কিংবা যুবতী। বনের মাঝে নির্জন কুটিরে নারীরত্ন শকুন্তলাকে দেখে একাধারে প্রেমার্ত ও কামার্ত হলেন রাজা দুষ্মন্ত। নানাবিধ উপহার দিয়ে মুগ্ধ করার চেষ্টায় তিনি শকুন্তলাকে বললেন, “আজ হইতে আমার সমস্ত রাজ্য তোমার হউক; তুমি আমার ভার্যা হও”।।৩।।
এরপর তিনি বিয়ে সংক্রান্ত শাস্ত্রবাক্যের রেফারেন্স দিয়ে বলছেন,
“সুন্দরি, তুমি গান্ধর্ব্ব বিবাহ অনুসারে আমাকে গ্রহণ কর। কেন না ক্ষতিয়ের পক্ষে গান্ধর্ব্ব বিবাহই আট প্রকার বিবাহের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।”।।৪।।
গান্ধর্ব্বেণ চ মাং ভীরু! বিবাহেনৈহি সুন্দরি!।
বিবাহানাং হি রম্ভোরু! গান্ধর্ব্বঃ শ্রেষ্ঠ উচ্যতে।।৪।।
শকুন্তলাও রাজার প্রতি অনুরোক্ত হয়েছেন। কিন্তু তিনি রাজার এরকম প্রস্তাবে তাৎক্ষণিকভাবে রাজি হলেন না। তিনি বললেন, “আমার বাবা (কন্ব মুনি) আসুক। তিনি আমাকে আপনার কাছে সম্প্রদান করবেন।”
আমার বাবা রাগ করতে পারে, তিনি একজন মুনি, আমি বাবার ইচ্ছার বাইরে যেতে পারব না, “তিনি যাঁহার হস্তে আমাকে দান করিবেন, তিনিই আমার ভর্ত্তা হইবেন।।৬।।” – শকুন্তলা এসব কথা বলে রাজাকে ধৈর্য ধরতে বলেন। আর দুষ্মন্ত, “কিচ্ছু হবে না, তুমি চিন্তা কইরো না” এ ধরনের কিছু কথা বলে শকুন্তলাকে পটানোর চেষ্টা করেন আর কি!
যা হোক, এ পর্যায়ে বিবাহবিধি এবং উচিত-অনুচিত নিয়ে তাদের দু’জনের মধ্যে কিছু শাস্ত্রীয় বাহাস হয়। মহাভারতের রচয়িতা ঋষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস সেখানে শকুন্তলার মুখ দিয়ে মনু সংহিতার সেই বহুলালোচিত বক্তব্যটিও উপস্থাপন করেছেন, যেখানে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, “নারীর কোনো স্বাধীনতা নেই।”
“পিতা রক্ষতি কৌমারে ভর্ত্তা রক্ষতি যৌবনে।
পুত্রস্তু স্থাবিরে ভাবে ন স্ত্রী স্বাতন্ত্র্যমর্হতি”।।৭।।
পন্ডিতপ্রবর মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের পদ্যে এর বাংলা হল,
“জনক করিবে রক্ষণ শৈশব যখন,
যৌবনে রক্ষিবে পতি করিয়া যতন ;
বৃদ্ধকালে রক্ষা তারে করিবে তনয়,
স্বাধীনতা অবলারে দেওয়া ভাল নয়।”
এই যুক্তি খণ্ডন করে রাজা দুষ্মন্ত কি বলছেন শুনুন,
“আত্মনো বন্ধুরাত্মৈব গতিরাত্মৈব চাত্মনঃ।
আত্মনৈবাত্মনো দানং কর্ত্তুমর্হসি ধর্ম্মতঃ”।।১৩।।
“দেখ – নিজেই নিজের বন্ধু এবং নিজেই নিজের গতি; সুতরাং তুমি ধর্ম্ম অনুসারে নিজেই নিজকে দান করিতে পার”।।১৩।।
এই যে “নিজেই নিজকে দান করিতে পার” বা “আত্মনৈবাত্মনো দানং কর্ত্তুমর্হসি ধর্ম্মতঃ” কথাটা বেদব্যাস সুস্পষ্টভাবে সেখানে লিখলেন এবং সেটারই বাস্তবায়ন দেখালেন।
এখানে তিনি আট প্রকার বিয়ে, তার মধ্যে কোনটা উত্তম, কোনটা অধম; ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র বর্ণভেদে কার কোনটাতে অধিকার বা অগ্রাধিকার ইত্যাদি আবার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। কথাগুলো স্মৃতিশাস্ত্র তথা মনুসংহিতার রেফারেন্সেই বলা হয়েছে।
শাস্ত্রবাণী দিয়ে বিষয়টি “ধর্ম্মসঙ্গত” বোঝানোর পর শকুন্তলা গান্ধর্ব্য মতে বিয়েতে রাজি হলেন। তারপর বলছেন,
যদি ধর্ম্মপথস্ত্বেষ যদি চাত্মা প্রভর্মম।
প্রদানে পৌরবশ্রেষ্ঠ! শৃণু মে সময়ং প্রভো।।।২১।।
“পৌরবশ্রেষ্ঠ, যদি ইহা ধর্ম্মসঙ্গত হয় এবং আমি যদি আমাকে দান করিতে সমর্থ হই, তবে আমার প্রার্থনা শুনুন”।।২১।।
এখানে তাদের মিলনে যে সন্তান জন্ম নেবে তাকে রাজা করতে হবে এই শর্ত দেন শকুন্তলা।
এই শাস্ত্র আলোচনাগুলো পরস্পরের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোক্ত এক জোড়া নরনারীর মধ্যে শুধু ঐ মুহুর্তের কথোপকথন ভাবলে ভুল করবেন। নরনারীর পরস্পরের প্রতি এরকম আত্মদানকে কণ্ব মুনি শাস্ত্রসন্মত হিসেবেই সেখানে স্বীকৃতি দিয়েছেন। মহর্ষি বেদব্যাস ও তার শিষ্য পরম্পরায় বৈশ্যাস্পায়নরা একে পরিপূর্ণ শ্রদ্ধায় পেশ করেছেন। মনে রাখতে হবে, হিন্দুদের সবচেয়ে প্রিয় শাস্ত্র গীতা মহাভারতেরই অংশ।
এখানে প্রচলিত শাস্ত্রীয় নির্দেশের আরেকটি লঙ্ঘন অনুমোদন করার বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, কণ্ব মুনির পালিত সন্তান হিসেবে বিবেচনা করলে শকুন্তলা ব্রাহ্মণ কন্যা। আবার বিশ্বামিত্র ঋষির ঔরসজাত সন্তান হিসেবে বিবেচনা করলেও তিনি ব্রাহ্মণ কন্যা। কিন্তু রাজা দুষ্মন্ত ছিলেন ক্ষত্রিয়। শাস্ত্রে উচ্চ বর্ণের পুরুষের সঙ্গে নিম্নবর্ণের কন্যার বিয়ের বৈধতা আছে, যাকে অনুলোম বিবাহ বলে। কিন্তু নিম্নবর্ণের পুরুষের জন্য উচ্চ বর্ণের কন্যার পাণীগ্রহণ বা প্রতিলোম বিবাহ নিষেধ করা আছে। তাহলে দুষ্মন্ত ক্ষত্রিয় হয়ে কিভাবে ব্রাহ্মণ কন্যাকে বিয়ে করে?
এর ব্যাখ্যায় মহাভারতের ঐ পর্বে বলা হয়েছে, যেহেতু রাজা বিশ্বামিত্র জন্মসূত্রে ক্ষত্রিয় ছিলেন এবং পরে তপস্যা দ্বারা ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করেছিলেন, তাই তিনি জন্ম পরিচয় অনুসারে ক্ষত্রিয়ই। তাই তার ঔরষজাত কন্যা শকুন্তলা রাজা দুষ্মন্তের জন্য সমবর্ণের এবং বৈধ। এই ব্যাখ্যার পর যার যা ইচ্ছা বুঝুন।
শকুন্তলাকে বনের মধ্যে রেখে দুষ্মন্তের পলায়ন, শকুন্তলার গর্ভে ভরতের জন্ম, নিজ সন্তানকে রাজা দুষ্মন্তের অস্বীকার ও প্রতারণামুলক আচরণ, পরবর্তিতে দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার পুনরায় মিলন ইত্যাদি আছে। বিভিন্ন পুরাণে এই বর্ণনায় কিছু তারতম্য থাকলেও মৌলিক ভিন্নতা নেই। এর বিস্তৃত পাঠ ভাল পাঠকের জন্য। তাই আমার লেখায় সবটা নয়, মূল গ্রন্থ পড়ুন এবং অন্ধত্ব দিয়ে নয়, বিবেক দিয়ে উপলব্ধি করুন। জ্ঞানমনস্কতা বৈষম্যমুক্তির পথ দেখাক। রাধারাণী ও শকুন্তলাদের জীবন সহজ হোক; মানব মর্যাদাপূর্ণ হোক। শুভমস্তু।

[পুলক ঘটক; সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদ]

 ফেসবুক পেজফেসবুক প্রোফাইলটুইটার অ্যাকাউন্ট

বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদের ফেসবুক গ্রুপ

spot_imgspot_img
spot_img

আলোচিত

Related Articles