মনুর চোখ দিয়ে আজকের নারীকে দেখা

পুলক ঘটক: ছবির এই মেয়েটির নাম সাবরিনা গনজালেয পাস্তারস্কি (Sabrina Gonzalez Pasterski)। ইনি কোনো মডেল বা নায়িকা নন; ইনি একজন পদার্থ বিজ্ঞানী। আগামী ৩ জুন ওনার বয়স হবে ৩০ বছর। আমেরিকান এই নারী মাত্র ১০ বছর বয়সে বিমান চালানো শিখেছেন। তের বছর বয়সে তিনি নিজস্ব মেধায় বিমান বানানো শুরু করেন এবং ১৬ বছর বয়সে সেই বিমানে সফল উড্ডয়ন করেন। ২০১৯ সালে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। আমাদের তরুণরা যখন সামান্য একটি চাকরি পাওয়ার জন্য মরিয়া, তিনি তখন মার্কিন গবেষণা সংস্থা নাসার দেয়া চাকরির অফারও ফিরিয়ে দিয়েছেন।

গতকাল যখন বিপ্লব কুমার প্রামাণিকের একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে সাবরিনার সম্পর্কে জানছিলাম, তার অল্প আগেই পড়েছি আমাদের ধর্মশাস্ত্র মনু সংহিতা নারীকে কত বেশি মর্যাদা দিয়েছে তার বর্ণনা। দুটি মেলানোর চেষ্টা করছিলাম। এখানে তিনটি শ্লোক বাংলায় উদ্ধৃত করে তার উপর কিছু মন্তব্য যুক্ত করতে চাই।

১. মনু ১/২৬: যে নারীরা সন্তান জন্মদানের জন্য ঘরে সৌভাগ্য নিয়ে আসে, আদর ও সম্মানের যোগ্যা, গৃহজ্যোতি হয়, তারাই নারী। শোভা, লক্ষ্মী এবং স্ত্রীর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, নারী ঘরের সাক্ষাৎ শোভা হয়।

মন্তব্য: তাহলে সাবরিনা কি? এই শ্লোকটি সাবরিনার ক্ষেত্রে কতটুকু প্রযোজ্য? তিনি কি গৃহের জ্যোতি? তিনি কি ঘরের সাক্ষাৎ শোভা? তার জন্য কি রকম মর্যাদা?

২. মনু ৯/২৬ : স্ত্রী লোকেরা সন্তানাদি প্রসব ও পালন করে থাকে। তারা নতুন প্রজন্ম বা উত্তরসুরির জন্ম দেয়। তারা গৃহের দীপ্তি বা প্রকাশস্বরূপ। তারা সৌভাগ্য ও আশীর্বাদ বয়ে আনে। তারাই গৃহের শ্রী।”

মন্তব্য: “স্ত্রী লোকেরা সন্তানাদি প্রসব ও পালন করে থাকে” সাবরিনা কি তার দৃষ্টান্ত? নারী কি সন্তানাদি প্রসব ও পালনের যন্ত্র? সন্তান উৎপাদন ও পালনে তো পুরুষেরও ভূমিকা আছে। অথচ শুধু নারীর ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এরকম। সাবরিনা কি গৃহের অভ্যন্তরের দীপ্তি ও শ্রী? তারা কি শুধু গৃহের অভ্যন্তরে থাকার জন্য জন্মেছে?

৩. মনু ৯/২৮ : প্রজন্ম থেকে প্রজন্মোন্তরে স্ত্রীরাই সকল সুখের মূল। কারণ, সন্তান উৎপাদন, ধর্ম পালন, পরিবারের পরিচর্যা, দাম্পত্য শান্তি এসব কাজ নারীদের দ্বারাই নিষ্পন্ন হয়ে থাকে।”

মন্তব্য: এখানেও নারীর ভূমিকা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মোন্তরে সকলের সুখের উপাদান হিসেবে। তাদের কাজ সন্তান উৎপাদন, ধর্ম পালন, পরিবারের পরিচর্যা ও দাম্পত্য শান্তি। মনু সংহিতার এই শ্লোক বর্তমানের নারীদের জীবনকাঠামো ও মর্যাদা নির্ধারণে কতটুকু প্রযোজ্য?

সাবরিনা একটি ব্যতিক্রমী মেধা। তাই নারী হিসেবে তাকে গৃহের শোভা ভাবা সমীচীন নয়। তবে অন্য সকল নারীর ক্ষেত্রে মনুসংহিতার বার্তাই সমীচীন – এই যুক্তি দেবেন? ইন্দিরা গান্ধী, শেখ হাসিনা বা স্পীকার শিরীন শারমিন চৌধুরীও বেশি উপরের হয়ে যায়। তাদেরকেও মনুসংহিতার এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাদ দেই।

গত ২৯ এপ্রিল টাঙাইলের সখিপুরে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী সেখানকার ইউএনওকে নারী হওয়ার কারণে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জানাজার সময় রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার দিতে দেননি। সেই ইউএনও আপনার-আমার মেয়ে হতে পারে কিনা? নারী হওয়ার কারণে তার প্রতি যে অবিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হয়েছে আমরা তার সমালোচনা করেছি। কিন্তু মনু’র চোখ দিয়ে দেখলে আপনার-আমার দৃষ্টিটাও সেরকম হয়ে যাবে কিনা?

আপনার মেয়েকে ইউএনও বা ম্যাজিস্ট্রেট বানানোর স্বপ্নও বাদ দিন। আপনার মেধাবী মেয়েটি একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক বা অন্য কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় যেতে পারে কিনা? মেয়েকে অতদূরও নিয়ে যেতে পারবেন না? মেয়েটি একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ হতে পারবে তো? মেয়েকে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন তো? সেই শিক্ষিত মেয়েটির ভবিষ্যৎ কি নিছক গৃহের শোভাবর্ধন করা?

নারীদের তথা বাংলাদেশের হিন্দু সমাজের ভবিষ্যৎকে আপনারা কিভাবে গড়তে চান? মনুর জীবন দৃষ্টিভঙ্গি পুরাতন সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষিতে প্রকাশিত। বর্তমানের জীবনকে সেই অতীতের জায়গাতেই বেঁধে রাখলে আমরা এগোবো, না থেমে যাব, নাকি পিছাবো? আপনি দেড় হাজার বছরের পুরাতন চোখ দিয়ে দেখবেন, ৫০০০ বছরের পুরাতন চোখ দিয়ে দেখবেন, নাকি আজকের চোখ দিয়ে আজকের পৃথিবীকে দেখবেন?

লেখক: সাংবাদিক; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদ
spot_imgspot_img
spot_img

আলোচিত

Related Articles